Saturday, December 5, 2020
- Advertisement -
Home ভ্রমন মন মাতানো মুন্নারের সবুজের সমারোহে

মন মাতানো মুন্নারের সবুজের সমারোহে

“যখন সময় থমকে দাড়ায়” নচিকেতার এই গান কষ্টের, দুঃখের, হতাশার আর ক্ষোভের। কিন্তু মুন্নারের এই জায়গায় এসে আমার সময়, আমাদের সময় থমকে দাড়িয়েছিল। কিন্তু কোনো দুঃখ, কষ্ট, হতাশা বা ক্ষোভে নয়। ঠিক এর উল্টো অনুভূতি নিয়ে। আনন্দে, অবাক হয়ে, বিস্ময়ে আর সুখের আতিশয্যে! হ্যাঁ, ঠিক তাই, মুন্নারের এই প্রান্তরে এসে আমাদের অনুভূতি এমনই হয়ে গিয়েছিল…

“যখন সময় থমকে দাড়ায়” নচিকেতার এই গান কষ্টের, দুঃখের, হতাশার আর ক্ষোভের। কিন্তু মুন্নারের এই জায়গায় এসে আমার সময়, আমাদের সময় থমকে দাড়িয়েছিল। কিন্তু কোনো দুঃখ, কষ্ট, হতাশা বা ক্ষোভে নয়। ঠিক এর উল্টো অনুভূতি নিয়ে। আনন্দে, অবাক হয়ে, বিস্ময়ে আর সুখের আতিশয্যে!

হ্যাঁ, ঠিক তাই, মুন্নারের এই প্রান্তরে এসে আমাদের অনুভূতি এমনই হয়ে গিয়েছিল যে কারণে নচিকেতার ওই কষ্টের গানের ভাবার্থ সেই সময়ে আমাদের কাছে সুখে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। অবাক বিস্ময়ে আমাদের সময় সেদিন থমকে গিয়েছিল, সবুজের এমন ঢেউ দেখে, চা বাগানের এই অপরূপ শেড দেখে, সবুজের ঢেউকে আকাশের সীমানায় পৌঁছে যেতে দেখে, সবুজের মাঝে হলুদের অপরূপ নান্দনিকতা দেখে।

আমরা ফিরছিলাম মুন্নারের সকালে ছোট ছোট চা বাগান, ছোট-বড় আর মাঝারি পাহাড়ের সারি, জুম চাষ, হাতির অভয়ারণ্য, টলটলে জলের ঝকঝকে লেক, বাঁধ, সবুজের মিহি গালিচা ঘেরা পার্ক, স্বচ্ছ জলে রঙ-বেরঙের বোটের ভেসে চলা, রাবার আর পাইনের অরণ্যে, নাম না জানা ফুলের খামার, পাহাড়ের ভ্যালীতে বর্ণীল বাগান, বিস্ময়কর হানি ট্রি! আর পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে হেলেদুলে।

মাঝে এক জায়গায় থেকে সকাল আর দুপুরের মাঝের খাবার খেয়ে নেবার বিরতি দেয়া হলো, নুডলস আর বয়েল আণ্ডা। বেশ ভালোই লেগেছে আর সব সময়ই লাগে চলতি পথে সহজে আর অল্প খরচের এই খাবার, বয়েল আণ্ডা আর সবজি দিয়ে সেদ্ধ নুডলস। তিনজন মিলে পেট ঠাণ্ডা করে আবার উঠে পড়লাম।

এবার আমাদের ফেরার পালা। দুপুর দুইটা পর্যন্ত যতদূর যাওয়া যায়। পথে দুই একটি ঝর্ণা পড়বে রাস্তার সাথে লাগোয়া। পাহাড় থেকে ঝর্ণা ধারা সোজা রাস্তায় এসে পড়েছে, পথচারীদের একটু প্রশান্তি দিতে।

বেশ কিছুটা উঁচুনিচু পথে পেরিয়ে, মুন্নারের ছোট্ট কিন্তু বনেদী শহর পেরিয়ে, গতকাল যে পথে এসেছিলাম সেই পথে চলতে শুরু করেছি। একটু পথ যেতেই দোকান, বাড়ি আর কিছুটা জনাকীর্ণ জায়গায় আমাদের অটো দাঁড়িয়ে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো পায়ে হেঁটে একটু ভিতরে গেলেই অনেক পুরনো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও আগের একটি লোহার ঝুলন্ত ব্রিজ আছে।

গেলে দেখে ভালো লাগবে বলে জানালেন। বাপ বেটা নেমে পড়লাম। কিন্তু একটু এদিক ওদিক করে তেমন আকর্ষণীয় কিছু দেখতে না পেয়ে ফিরে এলাম। দেখা হলো কিনা জানতে চাইলো ড্রাইভার, কিছুটা অবাক কণ্ঠে। জানালাম আমরা খুঁজে পাইনি।

সেটা শুনে আশ্বস্ত হলেন, যাক তাহলে এখনো তার হতাশ হবার তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ হলো এই ব্রিজটা এতটাই চমৎকার আর দৃষ্টি নন্দন একটা জায়গায় অবিস্থিত যে, যে কেউ ওটা দেখে, ওটার উপরে উঠে, হেঁটে আর দোল খেয়ে বার বার বলতে বাধ্য হবে ওয়াও, ওয়াও! আমার মতো ওয়াও শব্দ অপছন্দ করা সেকেলে লোকও বার বার ওয়াও ওয়াও করে উঠেছি!

ড্রাইভার আবারো পথে দেখিয়ে দিলেন। এবার আমরা একটা দোকানের পাশের ছোট গলি দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। গলি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে ফাঁকা জায়গায় গিয়েই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর উপরে দুই প্রান্তকে এক করেছে অনেক পুরনো লোহা আর কাঠের পাটাতনের এক ঝুলন্ত ব্রিজ। যেটা মৃদু বাতাসেই রীতিমত দুলছে! দেখেই অজান্তেই মুখ দিয়ে বেড়িয়ে গেল ওয়াও! অসাধারণ তো! ছেলেকে বললাম, চল বাবা যাই?

কিন্তু কোথায় সে? তাকিয়ে দেখি কখন যেন সে এক দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়েছে সেই দারুণ ঝুলন্ত ব্রিজে। আমিও উঠে পড়লাম আর দেরি না করে। সাথে ছেলের মাকেও ডেকে নিলাম। ব্যস, তিনজন মিলে সেই ঝুলন্ত ব্রিজে উঠে চারপাশের অপরূপ প্রকৃতি উপভোগ করতে লাগলাম। যার দুই পাশে পাহাড়, যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে বহমান এক পাহাড়ি নদী। যে নদীর একপাশে শহরের গড়ে ওঠা, অন্যপাশে যেন এক নিখাদ গ্রাম, ছোট ছোট কুড়ে ঘর, একটু সমতল মাঠ, মাঠে গরু, ছাগল আর কুকুরদের বিচরণ।

নদীর ধারে অনেকটা জংলী প্রকৃতি, ঝুলে পড়া ঘাস, লতা, পাতা আর ওদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে নিজের পথে ছুটে চলা পাহাড়ি নদীর জল। নানা রঙের জংলি ফুলের বর্ণিলতা। ওপাশের ছোট্ট নিখাদ গ্রাম থেকে ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে হেঁটে আসা ছেলে মেয়ে আর বড়দের কয়েকজন। কেউ ব্যাগ কাঁধে স্কুল বা কলেজের পথ ধরেছে, কেউ ছাতা হাতে গঞ্জের কোনো দোকানে নিত্য দিনের প্রয়োজনে।

ঝুলন্ত ব্রিজে দাঁড়িয়ে দোল খেতে খেতে এসব দেখছিলাম আর মোহাচ্ছন্ন হয়ে চারদিকের রূপ অবলোকন করছিলাম। দূরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মেঘেদের আনাগোনা, জেঁকে বসা, ছুটে চলা, একে অন্যকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া। শুনছিলাম আরও উঁচু পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছুটে আসে পাহাড়ি নদীর জলের কলতান, ব্রিজের নিচ থেকে ছুটে চলা খরস্রোতা নদীর অনবদ্য রূপ আর সেই সাথে আমাদের ক্যামেরা আর মোবাইলে ক্লিক ক্লিক ক্লিক।

বেশ অনেকটা সময় সেখানে কাটিয়ে, পাহাড় দেখে, আধুনিক শহরের ছোট্ট পাহাড়ি নদীর ওপাশে গ্রামের স্পর্শ নিয়ে, পাহাড়ি নদীর জল ছুঁয়ে, ফুল দেখে, ভেসে যাওয়া মেঘ নিয়ে খেলা করে, আর নিজেদের এমন অনবদ্য প্রকৃতির মাঝের নানা রকম স্মৃতি আগলে রেখে আবারো অটোতে করে সামনের পাহাড়ের দিকে চলতে শুরু করা। এবার এক পাশে বিশাল পাহাড়ের পিঠ কেটে বানানো মসৃণ রাস্তা আর অন্যপাশে গভীর খাদ। তবে রাস্তা জুড়ে বেশ ভালো নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করছিল পথ চলতে।

তাই পাহাড়ি পথে এঁকেবেঁকে আবারো ছুটে চলা। তবে এবার ধীর লয়ে, খুব ধীরে ধীরে আমাদের অটো পাহাড়ের পিঠ বেয়ে চলেছে সামনের দিকে। সামনে যতদূর চোখ যায় আকাশের সাথে পাহাড়ের আলিঙ্গন! নীল আকাশের সাথে মিশে মিশে আছে সবুজ আর বিশাল বিশাল পাহাড়ের সিঁড়ি।

একটা জায়গায় থামলাম। আসলে বাধ্য হলাম অটোকে থামিয়ে নেমে যেতে। নীল আকাশ, সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ রাস্তা আর পাহাড়ি ঝর্ণা দিয়ে খরস্রোতা পাহাড়ি নদীতে-পাথরে ঝরে পড়া জলের ঝড় দেখে। আর তারপরেই সেই “যখন সময় থমকে দাড়ায়” মুহূর্ত! আহা সে যে কী সবুজ, সবুজ প্রান্তর, সবুজের সমুদ্রে যেন সবুজের অবিরাম ঢেউ!

সবুজ আর হলুদের ঢেউ যেন পাহাড় থেকে আকাশের কাছাকাছি ছুটে যেতে চাইছে। সবুজের ঢেউ যেন ওই নীল আকাশকে ছুঁতে চাইছে! সবুজ চা বাগান তো অনেক দেখেছি, কিন্তু এমন প্রান্তর জুড়ে, মাটি থেকে আকাশ আর আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত সবুজের ঢেউয়ের দেখা আগে পাইনি কখনো, শুধু সিনেমা আর গুগলের ছবি ছাড়া।

আর সেই সবুজের ঢেউ, সবুজের সমুদ্র আর মাটি থেকে আকাশ ছোঁয়া সবুজ এই প্রথম চোখের সামনে, হাত ছোঁয়া দূরত্বে, মন-প্রাণ আর মননের স্পর্শের অনুভূতিতে। যেখানে যেদিকে তাকাই শুধু সবুজ, সবুজ আর সবুজ। সবুজের মাঝে ছোট ছোট বর্ণিল বাড়ি, লাল-হলুদ আর বেগুনী-গোলাপির ছড়াছড়ি, মাথার সিঁথির মত মিহি রাস্তা সবুজের বুক চিরে ছুটে চলেছে আরও সবুজের মাঝে, সবুজের প্রান্তরে, সবুজের ঢেউয়ে, সবুজের সমুদ্রে!

সুখে, আনন্দে, বিস্ময়ে, হতবাক হয়ে চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম অপলক নয়নে, কতক্ষণ জানি না। শুধু জানি আরও কিছুটা সময়, আরও একটা বেলা আরও একটা দিন বা নীরব কোনো রাতে কেন তাকিয়ে থাকতে পারলাম না সেই সবুজের ঢেউয়ে, সবুজের প্রান্তরে, সবুজের সমারোহে।
ফিচার ইমেজ- লেখক

- Advertisment -

সর্বশেষ

ঢাকায় ফিরলো ‘আয়না’ চলচ্চিত্রের টিম

3
আনিফা আরশি: গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবরের নতুন সিনেমা ‘আয়না’। গত ১৪ই অক্টোবর থেকে ধামরাই শুরু হয়েছিলো শুটিং। মোহনা মুভিজ এর ব্যানারে...