Saturday, December 5, 2020
- Advertisement -
Home সাউথ ইন্ডিয়ান ফোন বুথ অপারেটর থেকে তামিল সুপারস্টার

ফোন বুথ অপারেটর থেকে তামিল সুপারস্টার

আনিফা আরশি:

২০০৪ সাল। সুনামি অনেকের জীবন তছনছ করে দিয়ে গেল। কে জানত, এই সুনামিই শুরু করে দিয়ে যাবে ভারতীয় এক মধ্যবিত্ত আনাড়ি ছেলের সুপারস্টার হওয়ার গল্পটি। জীবন নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল কেবল এইটুকুই—ঋণ শোধ করতে হবে, বান্ধবীর সঙ্গে বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে এবং একটা সুন্দর বাড়ি বানানো। অন্যরা যখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর, বিজয় তখন স্রোতে গা ভাসিয়ে চলছেন। বাবা বলছেন, ‘পড়ালেখায় মনোযোগ দাও।’ বিজয় পাড়ি জমালেন দুবাই। পড়ালেখা করে কী হবে? ঋণ শোধ, বিয়ে আর সুন্দর একটা ঘর বানাতে চাই টাকা!লোন শোধ হয়নি, বিয়েটা আছে প্রেমের ঘরে আর বাড়িটাও আছে স্বপ্নেই। আবার দেশে ফেরা। হন্নে হয়ে খুঁজছেন কাজ। ছোটখাটো কাজেও আপত্তি নেই তাঁর। কারণ, অভিজ্ঞতা ছিল রিটেইল স্টোরের সেলসম্যান কিংবা টেলিফোন বুথের অপারেটিংয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে শুরু করেন ইন্টেরিয়র ডিজাইন, কখনো মার্কেটিংয়ের কাজ। কিন্তু তামিল ছবির রুপালি পর্দা যাঁর অপেক্ষায়, তাঁকে কি আর মার্কেটিংয়ের কাজে আটকে রাখা যায়! থিয়েটারের অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে অভিনেতা বনে গেলেন। ছোট কিংবা বড়, নায়ক কিংবা ভিলেন—সব চরিত্রেই যিনি মানিয়ে যান, তিনি আর কেউ নন, দক্ষিণ ভারতের তামিল সিনেমার নতুন সুপারস্টার বিজয় সেথুপাতি।

তামিল ছবির রুপালি পর্দা যাঁর অপেক্ষায়, তাঁকে কি আর মার্কেটিংয়ের কাজে আটকে রাখা যায়! থিয়েটারের অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে অভিনেতা বনে গেলেন। ছোট কিংবা বড়, নায়ক কিংবা ভিলেন—সব চরিত্রেই যিনি মানিয়ে যান, তিনি আর কেউ নন, দক্ষিণ ভারতের তামিল সিনেমার নতুন সুপারস্টার বিজয় সেথুপাতি।

রাজাপালায়াম থেকে চেন্নাই
বাবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। পড়ালেখা নিয়ে এতটুকু ছাড় নেই। বিজয় ঠিক তাঁর উল্টো। যেমন চলছে চলুক ধরনের। জন্মস্থান রাজাপালায়াম থেকে বিজয় এলেন চেন্নাই। পড়ালেখায় তখনো ইস্তফা দেননি। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। তাই নিজের পড়ার খরচটা নিজেকেই মেটাতে হয়। কী আর করা! পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে শুরু করলেন কাজ। কখনো রিটেইল স্টোরের সেলসম্যান তো কখনো টেলিফোন বুথের অপারেটর। অবশেষে ধনরাজ বৈদ জৈন কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব কমার্স ডিগ্রি নেন। সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে যোগ দেন একটি সিমেন্ট বিক্রির দোকানে। বেতন যা পান, তাতে তাঁর চলে। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের ভারও যে তাঁর ওপর। চলছে না আর। বিজয় পাড়ি জমান দুবাই। কাজ? ওই হিসাবরক্ষকই।

প্রেম ও ফেরা
কেবল বেশি টাকা রোজগারের জন্য দুবাই পাড়ি জমান বিজয়। কিন্তু মন টেকেনি। ফিরে আসেন দুই বছর পরই। তবে দুবাই থাকাকালীন খুঁজে পান মনের মানুষ জেসিকে। আবার গন্তব্য চেন্নাই। আবার শুরু হয় হন্নে হয়ে কাজ খোঁজার পালা। এর মধ্যে জেসিকে বিয়ে করে ফেলেন। জেসির সঙ্গে শুরু হয় জীবন নিয়ে নতুন পরিকল্পনা। কিন্তু মনের মধ্যে যাঁর অভিনয় লুকানো, তাঁকে কী করে অন্য কাজ ধরে রাখবে!সুযোগ কাজে লাগাও!
মনের মধ্যে তখনো অভিনয়টা বাসা বাঁধেনি। একদিন পরিচালক বালু মহেন্দ্রর চোখ আটকে যায় বিজয়ের চেহারায়। বালু মন্তব্য করে বসেন, ‘তোমার চেহারা তো বেশ ফটোজেনিক।’ পরামর্শ দেন সিনেমাতে অভিনয়ের। স্রোতে গা ভাসানো বিজয়ের হঠাৎ মনে হলো, এবার তবে একটু সিরিয়াস হতে হবে। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাটা জেগে উঠল মনে। বিজয় চলে আসেন কোথুপাট্টারি নাটকের দলে। চেন্নাইভিত্তিক এ নাট্যদল জানায়, এখন তাদের অভিনেতার কোনো দরকার নেই। একজন হিসাবরক্ষক দরকার। বিজয় কি যোগ দেবে? কী আর করা! অগত্যা বিজয় সেখানে কাজ নেন হিসাবরক্ষক হিসেবে। অভিনয়ের সঙ্গে থাকা গেল তো। ‘আমি আনন্দের সঙ্গে কাজে ঢুকে গেলাম। আমার দুটোই হচ্ছে। পরিবারকে টাকাও দিতে পারছি, আবার অভিনয়ের সঙ্গেও থাকতে পারছি। ছুটছি স্বপ্নপূরণে।’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডেকান ক্রনিকলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছিলেন বিজয়।

আমি আনন্দের সঙ্গে কাজে ঢুকে গেলাম। আমার দুটোই হচ্ছে। পরিবারকে টাকাও দিতে পারছি, আবার অভিনয়ের সঙ্গেও থাকতে পারছি। ছুটছি স্বপ্নপূরণে।সুনামিতে কপাল গেল খুলে
২০০৪ সাল। সুনামির আঘাতে বিশ্ব তখন নড়বড়ে। কিন্তু এই সুনামিই ভাগ্য বদলে দিল বিজয়ের। কোথুপাট্টারি নাটকের দল সুনামি–সচেতনতায় তামিলনাড়ুজুড়ে শুরু করল নাটক। আর কপালও খুলে গেল তাঁর। এত দিনের অধরা অভিনয়টা আচমকাই ধরা দিল বিজয়ের কাছে। তামিলনাড়ুজুড়ে এবার অভিনয় শুরু হয় তাঁর। অভিনয়ের যাত্রাটা শুরু হলো। হুট করেই থিয়েটার থেকে ঢুকে পড়লেন ফিল্মে। পরিচালক সেলভারাগাবানের ছবি `পুধুপেট্টিতে’। চরিত্রটি ছোট হলেও প্রথম ছবিতেই তিনি অভিনয় করেন তামিল সুপারস্টার ধানুশের সঙ্গে, তাঁর বন্ধু চরিত্রে। এরপর ধীরে ধীরে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। কখনো দর্শক, ফুটবল খেলোয়াড়, কাবাডি খেলোয়াড়—এমন ছোট ছোট চরিত্র করতে থাকেন তিনি।

ছোট পর্দায়
থিয়েটার করছেন। চলচ্চিত্রেও ছোট চরিত্রে কাজ পাচ্ছেন। এরই মধ্যে সুযোগ মিলল ডেইলি সোপে কাজ করার। একটি জনপ্রিয় চ্যানেলের ধারাবাহিকে কাজ পেলেন বিজয়। সেখানে ওই অঞ্চলের ছোট পর্দার বড় বড় অভিনেতা কাজ করতেন। তাঁদের কাছ থেকে শিখে নিলেন অভিনয়ের নানা কিছু। পরিচিত হতে শুরু করলেন। দর্শকের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো তাঁকে নিয়ে। বিজয়ের ভাষায়, ‘এই সময় আমাকে অল্প জনপ্রিয়তা এনে দিল এবং অভিনয়ের দুনিয়ায় আমি চলে এলাম।’

পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় টুকটাক কাজ। ছোট পর্দায় ডাক পান নিয়মিত। এবার সুযোগ এল স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের। এই প্রথম কোনো প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলেন বিজয়। ছোট ছবিতে কাজ করে তৃপ্তি ও প্রশংসা দুটোই আসা শুরু হলো। বেশ যাচ্ছে দিন। ছোট ছবির আঙিনায় এসে বিজয়ের পরিচয় হয় কার্তিক শুভরাজের সঙ্গে। এই জুটি বেশ কিছু প্রশংসিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উপহার দেন। বলা হয়, কার্তিক ও বিজয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে একটা অধ্যায়।

ছোট ছবিতে কাজ করে তৃপ্তি ও প্রশংসা দুটোই আসা শুরু হলো। বেশ যাচ্ছে দিন। ছোট ছবির আঙিনায় এসে বিজয়ের পরিচয় হয় কার্তিক শুভরাজের সঙ্গে। এই জুটি বেশ কিছু প্রশংসিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উপহার দেন। বলা হয়, কার্তিক ও বিজয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে একটা অধ্যায়।জাদুকরি মুহূর্ত
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় চলছে। কিন্তু চোখটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের দিক। তাই অভিনয়ের পাশাপাশি বিজয়ের এখন কাজ পরিচালক বালু মহেন্দ্রর অফিসের আশপাশে ঘুরঘুর করা। এক দিন, দুই দিন কিংবা তিন দিন নয়, দিনের পর দিন বালুর অফিসে যেতেন বিজয়। মরিয়া হয়ে খুঁজছিলেন একটা সুযোগ। একটা ছেলেকে এভাবে দিনের পর দিন আসতে দেখে মায়া হয় বালু মহেন্দ্রর। ডেকে নেন বিজয়কে। চলে স্ক্রিন টেস্ট। ক্যামেরায় বিজয়ের ছবি দেখে বালু যা বললেন, সেটাই হয়ে থাকল তাঁর জীবনের সেরা জাদুকরি ঘটনা। বিজয় বলেন, ‘তিনি আমাকে আমার কয়েকটি ছবি দিয়ে বললেন, আমার চোখ ও হাসি খুবই আকর্ষণীয়। এমন একটি জাদুকরি মুহূর্ত আমাকে তিনি উপহার দিলেন। জীবনের কোনো ঘটনার সঙ্গেই এর তুলনা করতে পারি না। বালু জানান, এমন চরিত্র পেলেই আমাকে ডেকে নেবেন।’

পথচলা শুরু
সুযোগ যখন আসে, তখন সব জানালা খুলে যায়। সিনেমাতে অভিনয় করলেও মনটা ঠিক ভরছিল না। তবে খুব একটা চমকপ্রদ গল্প খুঁজছেন এমনটি নয়। কিন্তু একজন ভালো পরিচালকের হাতে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করতে পারলে কপাল খুলে যায়। তখন একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছেন নালান কুমারাস্বামী। সোধু কাভাম ছবির জন্য ডাক পান বিজয়। কিন্তু বিজয় যে চরিত্রটি পছন্দ করেন, তার বয়স ৪০–এর মতো। পরিচালক না করে দিলেন। কিন্তু বিজয় দমবার পাত্র নন। ৪০ বছরের মেকআপ করে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলেন পরিচালকের কাছে। পরিচালক দেখে ‘থ’। শুরু হলো দাস চরিত্রে অভিনয়।

ভালো পরিচালকের হাতে অভিনয়টা ঝালিয়ে ঝালিয়ে সুপারস্টার বনে যাবেন বিজয়—এই ছিল নিয়তি। তাই এবার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক নয়—সব চরিত্রেই নিজেকে চেখে দেখলেন বিজয়। কখনো খলনায়ক তো কখনো নায়ক। বিজয় কলিউড সিনেমাতে এলেন নতুন দিনের সুপারস্টার হিসেবে।৫০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন বিজয়। শুধু অভিনয়ই নয়, একধারে তিনি অভিনেতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকবি ও প্লেব্যাক শিল্পী। মূলত তামিল সিনেমাতে কাজ করেন। তবে এখন দেখা যায় অন্যান্য সিনেমাতেও। এই মুহূর্তে বিজয়ের হাতে আছে ১০টির মতো ছবি। নাম ধরে বলা যেতে পারে লাল সিং চাড্ডা ছবির কথা। ফরেস্ট গাম্প–এর হিন্দি সংস্করণ এই বলিউড ছবিতে আমির খানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পর্দা ভাগাভাগি করবেন এই অভিনেতা।

জিনস ও শার্ট পছন্দ করা বিজয় সেথুপাতির প্রিয় রং কালো এবং প্রিয় খাবার বিরিয়ানি। স্ত্রী জেসিকে নিয়ে পরিবারে আছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। তামিল সিনেমার নতুন এই সুপারস্টার দিন দিন জায়গা করে নিচ্ছেন দর্শকের মনে। দর্শকও তাই তাঁর নাম দিয়েছেন ‘মাক্কাল সেলবান বা জনতার প্রিয়জন’।

সুত্র/প্রথম আলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সর্বশেষ

ঢাকায় ফিরলো ‘আয়না’ চলচ্চিত্রের টিম

3
আনিফা আরশি: গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবরের নতুন সিনেমা ‘আয়না’। গত ১৪ই অক্টোবর থেকে ধামরাই শুরু হয়েছিলো শুটিং। মোহনা মুভিজ এর ব্যানারে...