Saturday, October 24, 2020
- Advertisement -
Home বিবিধ দল নিয়ন্ত্রণে পছন্দের লোক খুঁজছেন তারেক

দল নিয়ন্ত্রণে পছন্দের লোক খুঁজছেন তারেক

দলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় নিজের পছন্দের লোক খুঁজছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আস্তে আস্তে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠদের বসাতে শুরু করেছেন। তবে কমিটি গঠন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় তিনি বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সংগঠন হিসেবে বিএনপির বর্তমান যে কাঠামো সেটি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হাতেই গড়া। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলকে তিনিই দেশের অন্যতম বড় দলে পরিণত করেন। দলটির বিভিন্ন কমিটিতে শীর্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ নেতাকে ‘খালেদা জিয়ার টিম’ বলে মনে করা হয়। কিন্তু আড়াই বছর ধরে বড় ছেলে তারেক রহমান দলের হাল ধরেছেন। আর এ কারণেই দলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আছে। কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নন। কারণ তারেক রহমানকে তাঁরা কেউ অসন্তুষ্ট করতে চাইছেন না।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দল সাজানোর ঘটনা সত্যি নয়। বিএনপির সবাই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। দলে কোনো বিভাজনও নেই।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পদ শূন্য হলে যোগ্য নেতাদেরই পদায়ন করা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুন্দরভাবে দল পরিচালনা করছেন।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘বিএনপির সবাই তাঁর (তারেক রহমান) পছন্দের। সবাই তাঁর।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘তারেক রহমান যাঁদের যোগ্য বলে মনে করেছেন তাঁদেরই বিভিন্ন পদে মনোনীত করেছেন। আর যোগ্য বলে দলও তাঁদের গ্রহণ করেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক নেতা বলেন, ‘ওয়ারিশ সূত্রে সব কিছুর মালিক তারেক রহমান। সেই অর্থে আমার মালিকও তিনি। তা ছাড়া তাঁর মা খালেদা জিয়ার পদায়নকৃত নেতাদের কেউ তো তাঁকে চ্যালেঞ্জ করছেন না।’

একটি দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে দল পরিচালনা করছেন তারেক। দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চ্যুয়াল বৈঠকগুলোতে সভাপতিত্ব করছেন তিনি। গত ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত হওয়ায় কারামুক্ত হয়ে খালেদা জিয়া গুলশানের ‘ফিরোজা’য় আছেন। তবে দল পরিচালনার ওই নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারের পাশাপাশি বিএনপির আইনজীবী নেতারাও বলছেন, আইনগতভাবে খালেদা জিয়া এখনো মুক্ত নন। ফলে আপাতত তিনি রাজনীতি করতে পারছেন না। পাশাপাশি শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় ভবিষ্যতেও তিনি রাজনীতি করতে পারবেন কি না এ নিয়েও দলের সর্বস্তরে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ কারণে নানামুখী আলোচনা সত্ত্বেও দলটির সিনিয়র নেতারা আস্তে আস্তে তারেকের কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, অনেক কিছু অপছন্দ হলেও রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরা দলের বাইরে গিয়ে ‘অনাস্থা বা অবিশ্বাসে’র খাতায় নাম লেখাতে চান না।

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় বারবার উঠে আসছে বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নাম। এক-এগারোর পর সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাঁর সমর্থক বলে পরিচিত অনেকের রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। মান্নান ভূঁইয়ার সমর্থকদের কেউ কেউ বিএনপি ছেড়ে গেছেন। আবার অনেকে দলে ফিরতে পারলেও কোণঠাসা অবস্থায় আছেন।

১৯৮৩ সাল থেকে খালেদা জিয়ার একক নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে বিএনপি। দল পুরোপুরি তাঁর নেতৃত্বে থাকার সময় তারেক রহমানের প্রভাব থাকলেও সেটি তেমন দৃশ্যমান ছিল না। যদিও ২০০১ সালের নির্বাচন পরিচালনা এবং মন্ত্রিসভা গঠনের নেপথ্যে তারেকের বেশ কিছু সমর্থক স্থান পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে বসার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারেকের ভূমিকা প্রথম দৃশ্যমান হয় খালেদা জিয়া কারাগারে থাকতে। ২০১৯ সালের ১৯ জুন স্থায়ী কমিটিতে তিনি মনোনয়ন দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং সেলিমা রহমানকে। ওই দুজন তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত হলেও দলে এ নিয়ে সমালোচনা হয়নি। তবে ওই সময় কেউ কেউ বলেন যে স্থায়ী কমিটিতে তারেকের মতামতের পক্ষে কথা বলার লোকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি গঠনও তারেকের পছন্দের লোকদের সমন্বয়ে হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। কমিটির চেয়ারম্যান পদে আমির খসরু ছাড়াও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ব্যারিস্টার মীর হেলাল, ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরসহ বেশ কয়েকজন সদস্য তারেকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তারেকের সমর্থক হলেও নওশাদ জমিরকে নিয়ে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে সমালোচনা আছে।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগরীর উত্তর বিএনপির কমিটি গঠিত হয় তারেক রহমানের পছন্দের লোকদের দিয়ে। ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যার আসামি এম এ কাইয়ুম অনেক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করলেও তারেকের ইচ্ছায় তাঁকেই উত্তরের সভাপতি করা হয়। তবে ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপিতে সমালোচনা আছে। কারণ বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত কাইয়ুম দেশে ফিরতে পারছেন না বলে মনে করা হয়। ওই ঘটনায় মহানগর উত্তর বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছর ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের হাতে উত্তরের কমিটির নেতারা লাঞ্ছিত হন।

সর্বশেষ তারেকের সিদ্ধান্তে ওই কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ নিয়েও কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়। গত ৭ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে আহসান উল্লাহ হাসান মারা গেলে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিটির সহসভপাতি আবদুল আলী নকিকে। কিন্তু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের ওই পদে নিয়োগ পাওয়ার কথা।

এদিকে গত সংসদ নির্বাচনের পর দল গোছানোর উদ্যোগ নিলেও নানামুখী বাধা ও আপত্তির কারণে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কমিটি অনেক জায়গায় করতে পারেননি তারেক রহমান। এ নিয়েও দলে অনেক ধরনের আলোচনা আছে। তারেকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাইফুল আলম নিরবের নেতৃত্বে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষিত হলেও আজ পর্যন্ত দেশের সব জায়গায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যায়নি। গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দুই দফায় সময় বাড়ানো হলেও চলতি সময়ের মধ্যে কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের কমিটির ঘোষণার মাত্র দুই দিনের মাথায় হঠাৎ করেই গত ৯ সেপ্টেম্বর ওই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গসংগঠন উদ্যোগ নিয়েও তারেক রহমান পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেননি। বরিশাল বিভাগে বেশির ভাগ জেলা কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কমিটি গঠন করা যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সর্বশেষ